পানি শব্দের বিরোধিতা করতে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী হিন্দুদের বিরোধিতা করলেন।
পশ্চিমবঙ্গে ‘পানি’ ও ‘আম্মা’ শব্দ নিষিদ্ধ
সম্প্রতি গণমাধ্যম থেকে জানা গেল, আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘পানি’ শব্দ নিয়ে আপত্তি তোলা হচ্ছে। নিজেদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকতে রাজনীতিকেরা যখন ধর্ম বা বিদ্বেষকে টেনে আনেন, তখন সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হয়। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মানুষের কাছে ‘পানি’ একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক শব্দ। মুখ্যামন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘পানি’ শব্দের প্রতি এই আপত্তি ভারতের অন্যান্য রাজ্যের লোক কীভাবে দেখবেন? উনি কি রামায়ণের বিরোধিতা করলেন তাহলে?কারণ রামায়ণ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও অন্যান্য হিন্দু গ্রন্থে পানি শব্দটি রয়েছে।নিজ ধর্মের ক্ষতি ধর্ম রক্ষকেরা করে। চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
১. ‘পানি’ শব্দের উৎপত্তি
‘পানি’ শব্দটি কোনো বিদেশ থেকে আমদানীকৃত শব্দ নয়; বরং এটি সংস্কৃত ‘পানীয়’ থেকে প্রাকৃত ভাষার মাধ্যমে বিবর্তিত হয়ে বাংলা ও হিন্দিসহ ভারতীয় উপমহাদেশের বিশাল একটি অঞ্চলে (হিন্দি, মারাঠি, গুজরাটি ও পাঞ্জাবিভাষী রাজ্যগুলোতে) প্রধান শব্দে পরিণত হয়েছে। ভারতের বহু সরকারি দপ্তরের দাপ্তরিক ও মাঠপর্যায়ের কাজে ‘পানি’ শব্দটি নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে
ভারতে সরকারি কাজে পানি শব্দের কিছু বাস্তব উদাহরণ:
- মহারাষ্ট্র সরকারের গ্রামীণ প্রকল্প পানি: মহারাষ্ট্রের সরকারি দপ্তরে খরা মোকাবিলা ও জল ব্যবস্থাপনার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে গঠিত কমিটির সাংবিধানিক ও দাপ্তরিক নাম ‘পানি পঞ্চায়েত’ (Pani Panchayat)। রাজ্য সরকারের গেজেট ও আইনগত নথিপত্রে এই নামই ব্যবহৃত হয়।
- গুজরাট ও উত্তর ভারতের সরকারি পরিভাষা: গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশের গ্রামীণ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন বিভাগগুলোর দাপ্তরিক ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে গুজরাটি এবং হিন্দিতে সরাসরি ‘পানি সমিটি’ (Pani Samiti) বা ‘পানি পুরবঠা’ পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়।
- ভারতীয় রেলওয়ে (Indian Railways): ভারতের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের স্টেশনগুলোতে রেলওয়ের নিজস্ব পানীয় জল ব্যবস্থার ট্যাপ বা স্টলগুলোতে হিন্দিতে বাধ্যতামূলকভাবে ‘पीने का पानी’ (Pine ka Pani - পানের পানি) কথাটি খোদাই করা থাকে, যা কোনো আঞ্চলিক কথ্য রূপ নয়, বরং দাপ্তরিক শব্দ।
![]() |
| শুভেন্দু অধিকারী |
ভারতের রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কাজে যে ‘পানি’ শব্দটি বহুল ব্যবহৃত, তাকে নিষিদ্ধ বা বিতর্কিত করার সিদ্ধান্ত মহারাষ্ট্র, গুজরাট বা ভারত সরকার মেনে নেবে কি? ‘পানি’ একটি আদি ভারতীয় ও প্রাকৃত শব্দ, যা ভারতের কোটি কোটি হিন্দু অধিবাসী দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করেন। রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে কিংবা ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়াতে গিয়ে ভারতের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অভিধানে থাকা বহুপ্রাচীন এবং সর্বজনগ্রাহ্য একটি শব্দের বিরোধিতা করা একেবারেই অযৌক্তিক।
২. প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বিভিন্ন বাংলা পুস্তকে ‘পানি’ শব্দের ব্যবহার
ক. চর্যাপদ (বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন)
প্রাচীন বাংলার এই সংকলনে জল বা তরল বোঝাতে ‘পানি’-র প্রাকৃত রূপের ব্যবহার পাওয়া যায়।
- মূল শব্দরূপ: পানী, পাণিআ, পণিআঁ।
- নির্দিষ্ট চর্যা: ১৪, ৩৫, ৪৩, ৪৫ ও ৪৭ নং চর্যায়।
- প্রসিদ্ধ পঙক্তি:
“জিম জলে পাণিআ টলিআ ভেঊ না জাঅ” (চর্যা ৪৩ – কবি ভুসুকপাদ)
খ. শ্রীকৃষ্ণকীর্তন (বড়ু চণ্ডীদাস)
এই মধ্যযুগীয় কাব্যে ‘জল’ ও ‘পাণী’ শব্দ দুটি কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক ভেদসংস্কার ছাড়াই সমান্তরাল ও স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
- অন্ত্যানুপ্রাসের প্রয়োগে:
“তোহ্মার বোলে কেহো কাহ্নাঞি
না বহিব পাণী。
উচিত নিফল হৈব তোর জল
ভাবি বুঝ চক্রপাণী।।” (যমুনা খণ্ড) - ছন্দ-নিরপেক্ষ স্বাধীন ব্যবহারে:
“আবাল গোপাল নাকর জঞ্জাল
পাণি নেউ সখিগণে।।”
“সব সখিগণে পাণী ভরায়িআঁ
নগর যাহা আপণে।
পানি ভরায়িআঁ ঘাটত উঠিআঁ
নিচল পাতিআঁ কাণে।।”
গ. কৃত্তিবাসের রামায়ণ (অন্যান্য হিন্দু গ্রন্থ)
মধ্যযুগের এই মহাকাব্যেও (ভারবি সংস্করণ) ছন্দের প্রয়োজনে কিংবা স্বাভাবিক কথ্য রূপ হিসেবে ‘পানি’ শব্দের সরব উপস্থিতি দেখা যায়।
- অযোধ্যাকাণ্ড (নদী পারাপারে):
“না জানিয়া ভেলা তায় বাঁধিয়া লক্ষ্মণ。
হাটুপানি পার হৈয়া গেলা তিন জন।।” - লঙ্কাকাণ্ড (চোখের জলে):
“কোলে করিয়া শ্রীরাম লক্ষ্মণে নাহি এড়ে。
মুকুতা গাঁথনি যেন চক্ষুর - কিন্কাণ্ড (জলজ পরিবেশ):
“পানির ভিতর থাকে তারা পানির মৎস্য ভোকে。
মানুষ ধরিয়া খায় যাহা পায় সমুখে।।”
তো পানি শব্দটি রামায়ণে রয়েছে, শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে রয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী মুসলিম বিদ্বেষ ছড়াতে গিয়ে নিজ ধর্মেরই ক্লাসিক সাহিত্যের বিরোধিতা করে দিলেন!আফসোস।ধর্মের ক্ষতি বেশি নাকি ধার্মিকদের হাত ধরে হয়।
৩. পশ্চিমবঙ্গে কি ‘আম্মা’ শব্দটিও বলা যাবে না?
‘আম্মা’ শব্দটি আরবি ভাষা থেকে আগত হলেও এর সাথে ‘মা’ শব্দের গভীর যোগ রয়েছে (যেমন: আম + মা = আম্মা)। আরবি থেকে এমন অনেক শব্দের উৎপত্তি হয়েছে যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ—যেমন কলম, কাগজ, হিসাব, বাজার, দোকান, মালিক, গরিব, ইজ্জত, খবর, জবাব, তারিখ, সময়, মৌসুম, সচল, হালনাগাদ, খেয়াল, পছন্দ, স্বভাব, মেজাজ, ফায়দা, আক্কেল, খাস, দলিল, দখল, মৌজা, ফসল, ইজারা, মোকদ্দমা, আসামী, সাক্ষী, রায়, খালাস এবং ওয়ারেন্ট।
মাননীয় শুভেন্দু অধিকারী কি তবে এই শব্দগুলোও বর্জন করবেন? কেবল ভারতীয় মুসলিম নয়, ভারতের কোটি কোটি হিন্দুও ‘আম্মা’ শব্দটি পরম আদরে ব্যবহার করেন।
৪. প্রাচীন ও ধ্রুপদী হিন্দু গ্রন্থে ‘আম্মা’ শব্দের উপস্থিতি
সনাতন ধর্ম ও প্রাচীন ভারতীয় প্রাচীন সাহিত্যে ‘আম্মা’ শব্দের ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে:
- বেদ ও পুরাণ (সংস্কৃত সাহিত্য): প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে মাতাকে বা মাতৃরূপী দেবীকে সম্বোধন করতে ‘অম্বা’ এবং ‘অম্বিকা’ শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন—যজুর্বেদ ও বিভিন্ন পৌরাণিক স্তোত্রে জগজ্জননী দুর্গা বা মহাশক্তিকে ‘অম্বা’ বা ‘অম্বিকা’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে।
- পালি ও প্রাকৃত গ্রন্থ (বৌদ্ধ ও জৈন সাহিত্য): প্রাচীন পালি ও প্রাকৃত ভাষায় রচিত ধর্মীয় ও লৌকিক সাহিত্যে (যেমন—পালি ত্রিপিটক ও জাতক কথাসাহিত্য) মাতৃস্নেহে বা শ্রদ্ধায় মাকে সম্বোধন করতে ‘আম্মা’ শব্দটির সরাসরি ব্যবহার পাওয়া যায়।
- দক্ষিণ ভারতীয় ভক্তিমূলক ও আগম শাস্ত্র: দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন তামিল ও সংস্কৃত মিশ্রিত আগম শাস্ত্র, স্তোত্রমালা এবং শ্রী বৈষ্ণব সাহিত্যগুলোতে দেবী বা মাতৃকুলকে শ্রদ্ধার সাথে ‘আম্মা’ নামে অভিহিত করা হয়েছে।
৫. ভারতের যেসকল রাজ্যে প্রায় সকল হিন্দু আম্মা শব্দ ব্যবহার করেন
ভারতের দক্ষিণ অঞ্চলের রাজ্যগুলোতে ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে প্রায় প্রতিটি হিন্দু পরিবারে মাকে ডাকতে প্রধান ও সর্বজনীন শব্দ হিসেবে ‘আম্মা’ ব্যবহার করা হয়। রাজ্যগুলোর নাম নিচে দেওয়া হলো:
- তামিলনাড়ু: তামিল ভাষায় মা বোঝাতে প্রধান ও একমাত্র জনপ্রিয় শব্দ হলো ‘আম্মা’। সেখানকার সব হিন্দু পরিবারে মাকে এ নামেই ডাকা হয়।
- কেরালা: মালয়ালম ভাষাভাষী কেরালা রাজ্যের হিন্দু সমাজে মাতাকে ‘আম্মা’ বলে সম্বোধন করা হয়।
- কর্ণাটক: কন্নড় ভাষাভাষী কর্ণাটকের প্রায় প্রতিটি হিন্দু পরিবারে মায়ের ক্ষেত্রে ‘আম্মা’ শব্দের প্রচলন রয়েছে।
- অন্ধপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা: তেলেগু ভাষাভাষী এই রাজ্যগুলোতেও প্রবীণা নারী ও জননীকে পরম শ্রদ্ধায় ‘আম্মা’ বলে ডাকা হয়।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন