এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রতি কেন রাষ্ট্রের এতো অবহেলা?
![]() |
| স্কুল শিক্ষক ও তার শিক্ষার্থীবৃন্দ। ছবি: আজকের পড়া |
আমাদের দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক শিক্ষার্থী এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনা করে। প্রতি বছর তারা অভাবনীয় সাফল্যের সাথে গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ এই বিশাল সাফল্যের পেছনে দিনরাত পরিশ্রম করে চলেছেন যে শিক্ষকেরা,রাষ্ট্র ও সমাজের নিকট আজ তারাই সবচেয়ে অবহেলিত।
কিছু প্রতিষ্ঠিত এবং বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তি প্রায়ই ব্যঙ্গ করে বলেন— "শিক্ষকেরা ক্লাসে ঠিকমতো পড়ান না।" তাদের প্রতি প্রশ্ন— শিক্ষকেরা যদি নাই পড়াতেন, তবে দেশজুড়ে এত লাখ লাখ চিকিৎসক, প্রকৌশলী আর আমলা তৈরি হলো কীভাবে?
অনেকে হয়তো বলবেন, শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট-কোচিং পড়ে ভালো ফল করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একজন ছাত্র যদি নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকে এবং মনোযোগী হয়, তবে তার প্রাইভেট পড়ার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। তাছাড়া বিজ্ঞান, ইংরেজি আর গণিতের বাইরে বাকি বিষয়ের কতজন শিক্ষক প্রাইভেট পড়ানোর সুযোগ পান? আসল সমস্যা হলো, শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট টিউটরের কাছে যতটা মনোযোগী, প্রাতিষ্ঠানিক ক্লাসে ততটাই উদাসীন। ছাত্ররা নিয়মিত ও মনোযোগী হলে শিক্ষকেরাও মানসম্মত ক্লাস নিতে বাধ্য থাকেন। হাতেগোনা কয়েকজন অলস শিক্ষকের উদাহরণ টেনে লাখ লাখ নিষ্ঠাবান এমপিওভুক্ত শিক্ষকের ত্যাগকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের নবীন শিক্ষকেরা পাঠদানে তুলনামূলক অনেক বেশি আন্তরিক ও তৎপর।
এমপিও (MPO) কী এবং বেতন প্রাপ্তির জটিলতা
MPO শব্দের পূর্ণরূপ হলো— Monthly Pay Order (মাসিক বেতন আদেশ)। অর্থাৎ, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতনের টাকা প্রতি মাসে নতুন করে অনুমোদন নিতে হয়। প্রায় ১৪টি প্রশাসনিক ধাপ পেরিয়ে একজন শিক্ষকের হাতে বেতন পৌঁছায়। এই দীর্ঘ ও সময়সাপেক্ষ জটিলতার কারণে প্রতি মাসের বেতন পেতে পেতে পরবর্তী মাসের ১০ থেকে ২০ তারিখ পার হয়ে যায়। মাসের মাঝামাঝি সময়ে বেতন পাওয়া একজন মধ্যবিত্ত শিক্ষকের জন্য কতটা কষ্টের, তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবে না।
সরকারি বনাম এমপিওভুক্ত শিক্ষক: বৈষম্যের বাস্তব চিত্র
বর্তমানে NTRCA এর মাধ্যমে সরকারি চাকুরী বিধি মেনে পরীক্ষা, ভাইভা দিয়ে লক্ষ লক্ষ প্রার্থীর মধ্যে মেধাবীরা সুযোগ পান। এমপিওভূক্তির অনুমোদন ও বেতন বকেয়া পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।হ্যাঁ, এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা সরকারি স্কেল বা গ্রেড অনুযায়ী মূল বেতন পেলেও, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে সরকারি চাকরিজীবীদের তুলনায় চরম বৈষম্যের শিকার।
১০ম গ্রেডের একজন সরকারি চাকরিজীবী এবং একজন এমপিওভুক্ত সহকারী শিক্ষকের প্রাপ্ত সুবিধার একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
সরকারি চাকরিজীবী (১০ম গ্রেড) সুবিধা
সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এমপিওভূক্ত শিক্ষকদের বেতনের তুলনামূলক আলোচনা।
**মূল বেতন* ১৬,০০০ টাকা
| **বাড়ি ভাড়া** | মূল বেতনের ৪৫%
| **চিকিৎসা ভাতা** | ১৫০০ টাকা
| **অন্যান্য সুবিধা** |
শ্রান্তি-বিনোদন ভাতা, সন্তানদের শিক্ষা ও চিকিৎসা ভাতা, শতভাগ উৎসব বোনাস
এমপিওভূক্ত শিক্ষকদের বেতন
মূল বেতন সরকারি স্কেলে পেলে বাড়িভাড়া ৭.৫% ও আরো ৭.৫% প্রস্তাবিত। চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা। বোনাস মূল বেতনের ৫০ শতাংশ। বিনোদন, শ্রান্তি ও শিক্ষা ভাতা নাই। অবসরে পেনশন সুবিধা নাই। এতোটুকু বেতন থেকে অবসর ও কল্যানের নামে ১০ শতাংশ প্রতিমাসে কেটে রাখা হয়।
অবসর জীবনের দীর্ঘ ভোগান্তি ও উৎসব ভাতা সংকট
একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক সরকারি অনুদান পেলেও আমৃত্যু পেনশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। উল্টো কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধা বোর্ডের (PF) নামে প্রতি মাসে মূল বেতন থেকে ১০ শতাংশ টাকা কেটে রাখা হয়। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, একজন শিক্ষক অবসরে যাওয়ার পর নিজের জমানো এই টাকাটুকু তুলতেই কমপক্ষে ৪-৫ বছর ধরে বিভিন্ন অফিসের টেবিলে টেবিলে ঘুরতে হয়। শিক্ষকদের এই কষ্টের টাকা নিয়ে এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা লুটপাট চালায়, আর দরিদ্র অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তীব্র ক্ষোভ, হতাশা ও অর্থের অভাবে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেন।
সরকারি চাকরিজীবীদের মতো এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা কোনো বিনোদন ভাতা পান না। অথচ শিক্ষার্থীদের আনন্দঘন পরিবেশে পড়ানোর জন্য শিক্ষকের নিজের মনের প্রফুল্লতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। এমনকি তাদের নিজেদের সন্তানদের জন্য কোনো শিক্ষা ভাতাও দেওয়া হয় না।
NTRCA এবং বর্তমান শিক্ষকতার চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে NTRCA-এর মাধ্যমে প্রিলিমিনারি, লিখিত ও ভাইভাসহ বেশ কয়েকটি কঠিন ধাপ পেরিয়ে সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে শিক্ষকেরা নিয়োগ পান। অনেক সময় নিজ জেলা থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাদের পদায়ন করা হয়। এই সামান্য বেতন আর আবাসন সুবিধা ছাড়া দূর-দূরান্তে গিয়ে চাকরি করা কতটা কষ্টের, তা সহজেই অনুমেয়। মেধাবীদের এই পেশায় ধরে রাখতে এবং মাধ্যমিক শিক্ষার মান উন্নত করতে হলে শিক্ষকদের সরকারি চাকরিজীবীদের মতো সম-সুযোগ সুবিধা দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
শেষ কথা
হিসেব করলে দেখা যায়, আমাদের দেশের শিক্ষকদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। শিক্ষকদের শুধু মুখে সামাজিক সম্মান দিলে চলবে না, অর্থনৈতিক সম্মানটুকুও সমভাবে নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে ঘন ঘন কারিকুলাম পরিবর্তন করেও শিক্ষাব্যবস্থার কোনো প্রকৃত ফায়দা হবে না।
দেশের প্রায় ৫ লক্ষ এমপিওভুক্ত শিক্ষকের পক্ষে রাষ্ট্র ও সরকারের কাছে আকুল আবেদন:
* অনতিবিলম্বে মূল বেতনের ৪৫% বাড়িভাড়া, পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ভাতা, শিক্ষা ভাতা ও বিনোদন ভাতা চালু করা হোক।
* বেতন থেকে অতিরিক্ত ১০% কর্তন বাতিল করে আমৃত্যু পেনশন বা সম্মানজনক অবসর ভাতার ব্যবস্থা করা হোক।
* অপরিকল্পিত প্রজেক্টের পেছনে অর্থ অপচয় বন্ধ করে, সেই বাজেট দিয়ে ক্রমান্বয়ে সকল মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ (Nationalization)** করা হোক।
জাতীর কারিগরদের বঞ্চিত রেখে কখনো একটি আদর্শ জাতি গড়ে উঠতে পারে না। শিক্ষকদের ক্ষুধার্ত রেখে শিক্ষাকে সমৃদ্ধ করা অসম্ভব। বাজেটে শিক্ষকদের প্রতি এই উদাসীনতা ও অবিচার অবিলম্বে বন্ধ হোক।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন