ব্রাত্য রাইসু: প্রচলিত চিন্তার বাইরে  অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব ও প্রকৃত বুদ্ধিজীবী

ব্রাত্য রাইসু: প্রচলিত চিন্তার বাইরে অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব ও প্রকৃত বুদ্ধিজীবী

Table of Contents

     ব্রাত্য রাইসু কে?

     রাইসু সাহেব আত্মপ্রচারক নন। তিনি অনেক ইতিহাসের সাক্ষী।অথচ বই করবেন-লিখবেন, পরে তা আর হয় না। এভাবে তিনি  সম্পর্ক-বন্ধুত্ব-রাজনীতির আড়ালে থেকে যান।ক্ষমতার সঙ্গে না থেকেও ক্ষমতা অর্জন তার রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে।আবার তিনি আমাদের মত  সুপ্ত লেখকও নন। আমরা যারা পরিচিত হওয়াকে অপ্রয়োজনীয় মনে করি বা লজ্জা পায় তাদের  মতও নন।রাইসু তার সম্পর্কে কোথাও বিস্তারিত লিখেছেন এমনটা আমার চোখে পড়েনি।খন্ড খন্ড লিখেছেন।। হয়ত নিজের সম্পর্কে একধরনের সাসপেন্স রেখে যেতে চান।ব্রাত্য রাইসুর বয়স সম্পর্কে যতটুকু জানা যায় ১৯ নভেম্বর ১৯৬৭ সালের শনিবার দিবাগত রাতে ঢাকার বাড্ডায় তার জন্ম। ঢাকায় বড় হয়েছেন।রাইসুর জন্ম পরবর্তী নাম "রইছ উদ্দীন মোহাম্মদ আবুল খায়ের ঢালী"। তিনি তার এই নাম পরিবর্তন করে ব্রাত্য রাইসু রাখেন। সাংবাদিকতা করতেন।তিনি একজন কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও সমালোচক। "বড় লোকদের সাথে মিশতে চায়" তার বিখ্যাত কবিতা।কবিতাটি শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বুদ্ধিজীবী মানস চৌধুরী আবৃত্তি করে তরুণ প্রজন্মকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।   "আকাশে কালিদাসের লগে মেঘ দেখিতেছি" তার বিখ্যাত বইগুলোর একটি।রাইসু সাহেবকে মূলধারার  গনমাধ্যমগুলোতে দেখা যায় না।তার সরব উপস্থিতি মেলে ফেসবুকে। 

    witer bratya raisu
    ফরহাদ মাজহার ও ব্রাত্য রাইসু। সংগ্রহ: ফেসবুক

     আমার সাথে রাইসুর পরিচয় 

    পেশায় আমি একজন হাই স্কুল শিক্ষক । কিশোর বয়স থেকে সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞান নিয়ে আমার বরাবরই আগ্রহ ছিল।এক সময় হুমায়ূন আহমদকে পড়তাম।প্রচুর পড়েছি।ওহ! ভালো কথা শোনা যায় হিমু চরিত্রটি নাকি রাইসুকে অবলম্বন করে লেখা। যাইহোক, তো হুমায়ূন পড়া শেষ হলে  শুরু করলাম আহমদ ছফার লেখা।রাইসু সাহেব আহমদ ছফার একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। রাইসু নামটা ঐখান থেকে প্রথম শুনি।উনি সম্ভবত "ষড়যন্ত্র তত্ত্ব"বিশ্বাস করেন।ফেসবুকে নারীবাদ সম্পর্কে লিখে বেশ আলোচিত হউন।তিনি মনে করেন,নারীবাদ হলো একধরনের পুরুষবাদ।পুরুষবাদের আরেক রুপ।একজন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারের নাম উল্লেখ করে "চিনি না" লিখে  রাইসু সোস্যাল মিডিয়াতে আরো বেশি আলোচিত হউন।বিখ্যাত সাংবাদিক খালেদ মহিউদ্দিন তার ফেসবুকে প্রিয় বুদ্ধিজীবীদের তিন জনের মধ্যে রাইসুকে রেখেছিলেন। এরপর থেকে অচেনা, অজানা কিন্তু আগ্রহী নেটিজেনরা  তাকে  ফলো করতে  থাকে।প্রথম কয়েকটি লেখা দেখে মনে হতে পারে রাইসু পাগল, অথবা এটেনশন সিকার। দিন শেষে এমন  একটি পোস্ট দেয় যা সকলের মুখ বন্ধ করে দেয়। সম্প্রতি তিনি তার ফেসবুকে একটি গভীর বিশ্লেষণ ধর্মী আর্টিকেল লিখেছেন।যা লিখেছেন তার সারাংশ হলো, ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশে জামাতে ইসলামির ক্ষমতায় আসার প্রয়োজন হবে। যতোবেশি বাংলাদেশে ভারত বিরোধিতা থাকবে বিজেপির ক্ষমতা ততোবেশি পাকাপোক্ত হবে।তাই বিজেপি চাইবে জামাত বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসুক। এই ষড়যন্ত্র তত্ব কতোটা সত্য তা বলা মুশকিল। এটাকে আমরা আপাতত অনুমান হিসেবে ধরে নিচ্ছি। সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় ইস্যু, আবেগ বা বিশ্বাসে আঘাতের ঘটনায় উভয় দেশে কিছু না কিছু প্রভাবতো ফেলে।  অর্থাৎ ভারতীয় রাজনীতিতে মুসলিম বিদ্বেষ  এখানকার মুসলমানদের  আঘাত করে।আর এখানকার ঘটনা ঐখানে।

    ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও  রাইসুর নিজস্ব দর্শন

    জাতীয় রাজনীতি নিয়ে তিনি লেখালেখি করেন। তবে অন্যরা যেভাবে করেন সেভাবে নয়। দু:খ-দুর্দশা, জাতীয় সংকট, কারো জন্ম-মৃত্যু এড়িয়ে লেখেন। উনার কিছু লেখায় "ষড়যন্ত্র তত্ত্ব" খুঁজে পাওয়া যায়। অর্থাৎ  তার মনে হয় সরকার বা বিরোধীদল মাঝে মাঝে বড় ইস্যুকে চাপা দিতে ছোটো ইস্যু সামনে আনে।একটি ঘটনার সাথে আরেকটি ঘটনার সম্পর্ক তৈরী করে আলোচনা ভিন্নখাতে নেয় মিডিয়া বা সরকার।লোকে যা সাধারণ ঘটনা বলে মনে করে।এটাই রাইসুর ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। তবে কি তিনি সংশয়বাদ প্রচার করেন। হয়ত আমার মতো তিনিও পলিটিক্সকে খুব সহজে বিশ্বাস করেন  না।কোন একটি ঘটনা তার সামনে আসলে তার পক্ষে-বিপক্ষে বা একটি নিরপেক্ষ বিন্দুতে দাঁড়িয়ে  ভাবেন। পক্ষ ও বিপক্ষ উভয় পক্ষকে নিরপেক্ষ করতে চান না। উনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন আমরা কেউই নিরপেক্ষ নয়। হয়ত উনি বোঝাতে চান আমরা কেউ সঠিক নয় আবার কেউ দোষী নয়। বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গা দিতে গিয়ে উনি বলেছেন, যারা সমস্যা ধরিয়ে দেয় তারা বুদ্ধিজীবী।সমাধান করা তাদের কাজ নয়।লোকে রাইসুকে মেনে নিতে পারেনা আবার ভুল প্রমাণ করতে পারে না।আসলে রাইসু তার পাঠকদের সাথে খেলেন। সারাদিন পাঠকদের উত্তেজিত রেখে দিনশেষে ছোট্ট স্ট্যাটাস দিয়ে শান্ত করিয়ে দেন।উনি উনার বিভিন্ন লেখায় বোঝাতে চান  বিজ্ঞানও একটি ধর্ম। কিছু লোক যেমন ঐশ্বরিক ধর্ম প্রচার করছে তেমনি কিছু লোক বিজ্ঞান ধর্মও প্রচার করছে।উনি হয়ত বোঝাতে চান আমাদের আদর্শ আর বিশ্বাস ভিন্ন কিন্তু মানুষিকতা এক।

    ব্রাত্য রাইসু মানুষকে বুঝতে পারেন। সমাজের সমস্যা,মানুষের দূর্বলতা গভীর থেকে তুলে ধরেন । অন্যদের চেয়ে ব্রাত্য রাইসুর চিন্তার গলিটা ভিন্ন।তার লেখা মানুষকে  চিন্তা করতে শেখায়।মনে হতে পারে তিনি ভুল বলছেন কিন্তু ভুলগুলো চিহ্নিত করে ব্যাখ্যা করা কঠিন।অনেক জ্ঞানী-গুণী, বুদ্ধিজীবী-অ্যাকটিভিস্টদের বলতে শোনা যায় ,"এটা করা উচিত, ঐটা করতেই হবে"। কিন্তু মানুষ তথা সমাজের সমস্যা আসলে কোথায়, তা রাইসুর মত করে এতোটা গভীর থেকে  কেউ  বলতে পারে না।খুব সম্ভবত তার কাজ সমস্যাগুলো গভীর থেকে তুলে আনা। অর্থাৎ ধরিয়ে দেয়া।আর আপনি আপনার করণীয় ঠিক করবেন।আসলে বুদ্ধিজীবী কিংবা দার্শনিকদের কাজ এটাই।সমাজের মৌলিক সমস্যা কোথায় তা মানুষকে জানানো।আর দাবি তুলে সমাধান দেয়া অ্যাক্টিভিস্ট ও পলিটিশিয়ানদের কাজ। 

     তিনি মবের বিরুদ্ধে বেশ সোচ্চার ছিলেন। বা কোথাও ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হলে তার অ্যাক্টিভিজম বেশ কড়া হয়। মানুষ দরকারবাদে বিশ্বাসী। হয়ত তার নিকট দেশের বড় সমস্যা এগুলোই।মানুষের জন্ম-মৃত্যু নিয়ে নিরব ভূমিকা এক বিস্ময়!ইতিহাসের যেমন ইতিহাস থাকে তেমনি চিন্তার অন্তরালে সুপ্ত চিন্তা থাকে। প্রচলিত  দর্শনের মধ্যে যে বিতর্ক রয়েছে তা তিনি সাবলীলভাবে তুলে ধরতে জানেন। যেমন বস্তু থেকে অনু তারপর পরমাণু তারপর ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন। অন্যরা এই পর্যন্ত ভাঙতে পারেন। কিন্তু রাইসু ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রনকেও ভাঙতে জানেন।

    শেষ কথা

    রাইসুর মত মানুষেরা শতাব্দীতে দু'চারজন জন্মে। এই শতাব্দীতে আহমদ ছফা, ফরহাদ মজহার, ব্রাত্য রাইসু, সলিমুল্লাহ  খান আর রিফাত হাসানরা জন্মেছেন। আমরা এসকল প্রকৃত বুদ্ধিজীবীদের মেসেঞ্জার হতে চায়।

    লেখক: মহাজাগতিক বৃত্তের বিন্দু। 

    রাইসুর ফেসবুক লিংক

    https://www.facebook.com/bratyaraisu

    আরো পড়ুন 

    রিফাত হাসান : রাজনৈতিক শব্দ  সৃষ্টির কারিগর 

    মন্তব্যসমূহ